স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ চান ব্যবসায়ীরাও

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: ৯ জুন, ২০২০

বলা হচ্ছে, করোনাভাইরাস কিংবা কভিড-১৯ পরবর্তী পৃথিবী ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই যাবে। সেই পরিবর্তন থাকবে মানুষের চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণায়। নিজেদের ব্যবসার প্রসার ও উন্নয়নে বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে উচ্চকিত থাকতেন সেই ব্যবসায়ীরাই এবার বাজেটে দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ প্রত্যাশা করছেন। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে স্বাস্থ্যসেবাকে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি অনিশ্চিত মহামারিকালে খাদ্যসংকট ঠেকাতে অগ্রসরমাণ কৃষি খাতকে আরো বেগবান করার গুরুত্ব অনুধাবন করে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

নিজেদের ব্যবসায় বিশেষ সুবিধার পরিবর্তে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার মতো এমন উপলব্ধির কারণ জানতে চট্টগ্রামের একাধিক ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয়। তাঁরা জানান, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের মহামারি মানুষের এতদিনকার ধ্যান-ধারণা ও চিন্তার গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত যে কতটা ভঙ্গুর তা সামনে নিয়ে এসেছে। করোনাকালীন দেখা গেছে হাজার কোটি টাকা থাকলেও বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে যদি দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত ও পর্যাপ্ত না হয়। পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতিও আসতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে নামি হাসপাতালে সর্বোচ্চমানের চিকিৎসা গ্রহণের সামর্থ্য থাকলেও আপনাকে সাধারণের হাসপাতালে একটু অক্সিজেন ও আইসিইউ বেডের জন্য হাহাকার করতে করতে মারা যেতে হবে। কিংবা হাসপাতালে হাসপাতালে একটু চিকিৎসার সুযোগ চেয়ে ধরনা দিতে দিতে কোটিপতিদের মারা যেতে হবে এমন দৃশ্য কল্পনার অতীত ছিল।

এসব বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বাজেটের পাশাপাশি সেই অর্থের যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি আবু তৈয়ব কালের কণ্ঠকে বলেন, কভিড-১৯ পরবর্তী পুরো বিশ্বের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা পাল্টে গেছে। দেশের স্বাস্থ্য খাত খুব সুবিধার না সেটা জানা ছিল। কিন্তু এত যে হতশ্রী তা সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানতেন না।
স্বাস্থ্য খাতে স্বাভাবিক কারণে এবার বাজেটে বরাদ্দ বাড়বে। তবে আমার মনে হচ্ছে সর্বোচ্চ বরাদ্দটা এবার স্বাস্থ্য খাতেই হওয়া উচিত। আগামীতে স্বাস্থ্য খাতে যে মহাপরিকল্পনা জরুরি তা এই বাজেটের মাধ্যমেই বার্তা দিতে হবে। একই সাথে বাজেটের ব্যয় যেন কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব নেওয়া হয় সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে বলে তিনি জানান।

আমাদের প্রত্যেকটি উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত কমিউনিটি স্বাস্থ্য ক্লিনিক আছে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও এমন প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা যায়নি। এখন দরকার শুধু এই ক্লিনিকগুলোকে পর্যাপ্ত সুবিধা দিয়ে কার্যকর করা। তাহলে স্বাস্থ্য খাতে একবছরের মধ্যেই দৃশ্যমান উন্নয়ন সম্ভব।

স্বাস্থ্য খাতের পরেই কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ দেশের কৃষক ও কৃষি কোনোদিন বেইমানি করেনি। গত কয়েকবছরে এই খাতটি বুস্টআপ করেছে। করনোকালীন গত কয়েকমাসে লকডাউনের কর্মহীন সময়েও এ দেশের মানুষ যে না খেয়ে মরেনি এর অন্যতম কারণ কৃষিতে আমাদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা। দেশে করোনার সংক্রমণের শুরুতেই দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি কৃষিতে নজর রেখেছিলেন। যে কারণে মাঠে ফসল যথাসময়ে কৃষকের গোলায় ওঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের এক একর জায়গাও যেন অনাবাদি না থাকে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এই ব্যবসায়ী নেতা স্বাস্থ্যসুরক্ষায় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন। বলেন, তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি। অথচ করোনার শুরুতে আমাদের মেডিক্যাল পিপিইর মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। পিপিই, মাস্ক, ভেন্টিলেটরের মতো জরুরা সুরক্ষা সামগ্রীতে বিনিয়োগকে উৎসাহ দিতে হবে। এ জন্য নতুন মেশিনারিজ ক্রয়ে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

এবার ঋণনির্ভর বাজেট হবে জানিয়ে বিজিএমইএর আরেক সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাছির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, করোনার কারণে রাজস্ব আহরণ হবে ভয়ানক চ্যালেঞ্জিং। ফলে আগামী বাজেট হবে ঋণনির্ভর। কষ্টার্জিত ও ঋণনির্ভর এই বাজেটের সবচেয়ে বড় বরাদ্দ স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য খাতে হওয়া উচিত। এই সেবা খাতটিতে একটা বৈপ্লবিক সংস্কার দরকার। আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেটা করবেন। একই সাথে কৃষি খাতে বড় বরাদ্দ দিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রবাসী যারা বেকার হয়ে দেশে ফিরবেন তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দরকার এই বাজেটে।

অন্যান্য খাতের মতো বাংলাদেশের পর্যটন খাতও করোনার কারণে বিপর্যস্ত। তবে এরপরেও বাজেট ভাবনায় স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতেই সর্বাধিক গুরুত্ব প্রত্যাশা করেন দেশের অন্যতম বৃহৎ ট্রাভেল এজেন্ট বিফ্রেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রফিকুল হাসান। তিনি কালের কণ্ঠের কাছে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে বলেন, অবশ্যই স্বাস্থ্য ও কৃষি খাত আসন্ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কৃষি খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই একটি মাত্র খাত আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেই গার্মেন্টশিল্প থেকে আমরা সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সেটিও কাঁচামাল, অর্ডারসহ অনেক কিছুতেই বিদেশনির্ভর। আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বর্তমান করোনাকাল আরো কতদিন চলবে তা হলফ করে বলারও সুযোগ নেই। তাই দেশে যেন খাদ্যসংকটে না পড়ে সে জন্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এখনও পেঁয়াজ, আদা, রসুনের মতো আরো যেসব খাদ্যপণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় সেসব পণ্য দেশেই উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।

আরও সংবাদ