জাহাজে-বাড়িতে আটকা চার লাখ নাবিক

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: ৯ জুন, ২০২০

বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক নৌযানের প্রায় চার লাখ ক্রু আটকে রয়েছেন বর্তমানে সাগর, বন্দর বা নিজ বাড়িতে। লকডাউন বা চলাচলে আরোপিত সীমাবদ্ধতার কারণে নিজ স্থান ত্যাগ করতে পারছেন না তারা। ফলে বাণিজ্যিক নৌ-পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সময়ে ক্রু বা নাবিক পরিবর্তন করতে পারছে না সমুদ্রগামী বাণিজ্যিক নৌযানগুলো। এসব ক্রু ও নাবিকের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন, যাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশিদিন ধরে জাহাজে অবস্থান করতে হচ্ছে। আবার বাড়িতে আটকা পড়ায় কাজে যোগ দিতে পারছেন না অনেকেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক দিকে মোড় নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বৈশ্বিক বাণিজ্যিক নৌ-পরিবহন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। খবর এফটি।

খাতসংশ্লিষ্ট নির্বাহী ও ইউনিয়ন সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাত নাবিক ও ক্রু সংকটে ভুগছে। গত সপ্তাহেও জার্মান মালিকানাধীন একটি ট্যাংকারের পক্ষ থেকে সমুদ্রযাত্রায় অস্বীকৃতি জানানো হয়। এ বিষয়ে ট্যাংকার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, পর্যাপ্তসংখ্যক ক্রু ও নাবিক প্রতিস্থাপনের আগ পর্যন্ত কোনোভাবেই সাগরে যাত্রা করবে না জাহাজটি। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত নাবিক ও ক্রু নিয়ে অনিরাপদ চলাচলের শঙ্কা দূর করতে এ কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্যাংকারটি।

খাতসংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, সমুদ্র বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট অন্যান্য জাহাজও ট্যাংকারটিকে অনুসরণ করতে পারে। বিশেষ করে ১৬ জুনের পর। আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন খাতে নাবিকদের চুক্তি নিয়ন্ত্রণকারী শ্রম বন্দোবস্তের জরুরি ভিত্তিতে বর্ধিত মেয়াদ শেষ হচ্ছে ওই দিন। সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর অনেক নাবিক রয়েছেন, যাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগেই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট চুক্তি বা বন্দোবস্তে নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে গেলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই জাহাজে অবস্থান করতে হচ্ছে তাদের।

আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিক ও অপারেটরদের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব শিপিংয়ের মহাসচিব গাই প্ল্যাটেন বলেন, সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, এখন একটি টাইম বোমা চালু হয়ে গিয়েছে। মানুষকে অনির্দিষ্টকাল ধরে কাজ করানো সম্ভব না। অনেকেই আছেন, যারা জাহাজে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন। বিষয়টি এখন যত দীর্ঘায়িত হবে, সরবরাহ চেইনেও তত ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের মহাসচিব স্টিভ কটন এ প্রসঙ্গে বলেন, নাবিকদের সাগরে আটকে রাখতে ১৬ জুনের পর এ বন্দোবস্তের মেয়াদ কোনোভাবেই বাড়ানো সম্ভব নয়। তারা এরই মধ্যে চুক্তির বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে অবস্থান করেছেন। আমরা নাবিকদের বলব না, তাদের জাহাজে থাকতে হবে। বরং তারা যদি বের হয়ে আসতে চায়, আমরা তাদের সহায়তা করব।

বর্তমানে বিশ্বায়িত বাণিজ্য ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হলো নৌ-পরিবহন খাত। জাতিসংঘের কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্য বলছে, বিশ্ব বাণিজ্যে কনটেইনারবাহী জাহাজ থেকে শুরু করে ফুয়েল ট্যাংকার ও ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ারসহ বিভিন্ন সমুদ্রগামী জাহাজের অবদান প্রায় ৮০ শতাংশ।

কিন্তু বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি এখন নৌপথে পণ্য পরিবহনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণে নাবিকরা জাহাজ থেকে নামতেও পারছেন না, নিজ দেশে ফিরতেও পারছেন না। আবার যারা ঘরে আটকা, তারাও নতুন নাবিকের জন্য অপেক্ষমাণ জাহাজে আরোহণের জন্য নিকটবর্তী বন্দরে যেতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় এন্ট্রি বা এক্সিট ভিসা সংগ্রহ করতে পারছেন না অনেক নাবিক। উপরন্তু উড়োজাহাজের বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এ সমস্যা হয়ে উঠছে জটিলতর।

তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সমুদ্রযান প্রায় ৯৬ হাজার। এসব জাহাজের নাবিক সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ, যাদের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এখন আটকা পড়ে আছেন জাহাজ বা বাড়িতে।

ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে গত মাসে নিরাপদে জাহাজের নাবিক পরিবর্তনসংক্রান্ত ১২ দফা সংবলিত একটি প্রটোকল প্রকাশ করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন দেশের সরকার এসব বাস্তবায়নে দেরি করায় বর্তমানে প্রতি সপ্তাহেই সাগরে আটকা পড়া নাবিকের সংখ্যা বাড়ছে বলে জানালেন গাই প্ল্যাটেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি তুলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নাবিকদের জন্য ‘নিরাপদ করিডোর’ স্থাপন করা হোক। একই সঙ্গে সমুদ্রগামী নাবিকদের অর্থনীতির ‘অপরিহার্য কর্মী’ স্বীকৃতি দিয়ে সমুদ্রযানে কাজে যোগদান বা সেখান থেকে ফেরার ক্ষেত্রে মুক্তভাবে চলাচলের সুযোগ দেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি দাপ্তরিক নথিপত্রকে পরিচয়ের প্রামাণিক দলিল বিবেচনায় নিয়ে বিমানবন্দরগুলোয় নাবিকদের নিরাপদ ট্রানজিট নেয়ার সুযোগ তৈরিরও দাবি তুলেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ-পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক নৌযানগুলোয় নাবিক ও ক্রু সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিনার্জি মেরিন গ্রুপের প্রধান নির্বাহী রাজেশ উমনি জানালেন, নেদারল্যান্ডসের মতো কয়েকটি দেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের প্রটোকলের ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সত্যি, কিন্তু তা খুবই অপর্যাপ্ত এবং বাস্তবায়নও বেশ শ্লথ। তিনি বলেন, আমরা চাই, বিভিন্ন দেশের সরকার অনুধাবন করুক, নাবিকরা কর্মী হিসেবে অপরিহার্য। যদি আমরা সরবরাহ চেইনকে অব্যাহত রাখতে চাই, তাহলে আমাদের সাগরের নাবিকদের কল্যাণের বিষয়টিতেও খেয়াল রাখতে হবে।

বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনারবাহী নৌবহর অপারেটর মার্স্ক জানিয়েছে, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ফ্লিট অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক ব্র্যান্ড চিফ হেনরিয়েট হেলবার্গ থিগেসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফিলিপাইন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং ক্রু পরিবর্তন হাবগুলোর মধ্যে নিরাপদ করিডোর স্থাপনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে নাবিকদের অপরিহার্য কর্মী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ-পরিবহন খাতসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে পিঅ্যান্ডও শিপিং লাইনের সাবেক চেয়ারম্যান জেফরি স্টার্লিংকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জেফরি স্টার্লিংয়ের ভাষ্যমতে, এটি যে শুধু একটি উদ্বেগজনক মানবিক ইস্যু, তা নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ-পরিবহনের বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করাটাও জরুরি। জাতি হিসেবে সমুদ্রপথে যুক্তরাজ্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সুতরাং, দেশটির এক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা রাখা উচিত।

তিনি জানান, যুক্তরাজ্যের ফার্স্ট সি লর্ড অ্যাডমিরাল টনি র্যাডাকিন এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজকীয় নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব জানিয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব শিপমাস্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএসএমএ) মহাসচিব জিম স্কোরার বলেন, নিয়ম অনুযায়ী, একজন নাবিক সাগরে অবস্থান করতে পারবেন সর্বোচ্চ ১১ মাস। কিন্তু অনেকেই এখন সাগরে অবস্থান করছেন ১৫ মাসেরও বেশি সময় ধরে। এদের অনেকেই এখন বিপজ্জনকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এছাড়া ক্লান্ত নাবিকদের নিয়ে জাহাজ চালানো হলে ক্যাপ্টেনদেরই ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হতে পারে।

আরও সংবাদ