• ঢাকা
  • বুধবার, ১০ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯ জুলাই, ২০২০
সর্বশেষ আপডেট : ৯ জুলাই, ২০২০

গ্লোব বায়োটেকের টিকা সফল হলে দাম নাগালেই থাকবে

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের কিছু উন্নত দেশই মূলত রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন (টিকা) কিংবা ওষুধ আবিস্কারের কৃতিত্বের দাবিদার। উন্নত দেশের গবেষকদের আবিস্কার করা টিকা কিংবা ওষুধের ফর্মুলা নিয়ে এসে দেশে উৎপাদনই প্রচলিত রীতি। এবারও কভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর বিশ্বের কয়েকটি উন্নত দেশের ওষুধ কোম্পানি ভ্যাকসিন আবিস্কারের জন্য প্রচেষ্টা শুরু করে। কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতের একটি কোম্পানির ভ্যাকসিন তৈরির প্রচেষ্টার খবর। এবার সেই খবরের সঙ্গে গর্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিনের ফর্মুলা উদ্ভাবনের পর তার সফল অ্যানিমেল ট্রায়ালের (পশুর ওপর প্রয়োগ) খবর দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডা. আসিফ মাহমুদ সমকালের সঙ্গে এই ভ্যাকসিন উদ্ভাবন নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, নানা ধাপ পেরিয়ে তাদের টিকা সফল হলে তার দাম মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকবে।

ডা. আসিফ জানান, বাংলাদেশেও একটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা হতে পারে, সে চিন্তা থেকেই গ্লোব বায়োটেকের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) ডা. কাকন নাগ এবং চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) ডা. নাজনিন সুলতানার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শুরু হয় গবেষণা। সিইও এবং সিওও দু’জনই ভাইরাসজনিত রোগের ভ্যাকসিন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ডা. কাকন নাগ এইচআইভির (এইডস) ভ্যাকসিন উদ্ভাবন গবেষণার সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের নির্দেশনায় ও নেতৃত্বে গ্লোব বায়োটেকের গবেষক দল কাজ শুরু করে। আর এই কাজের সাফল্য আসে খরগোশের ওপর এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের পর। দেখা যায়, খরগোশের দেহে ভ্যাকসিনটি সফলভাবে কাজ করছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচটি খরগোশের ওপরে পরীক্ষা করা হয়। গ্লোব বায়োটেক তিনটি ভ্যাকসিন ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছে, এ কারণে তিনটি ক্যান্ডিডেট তিনটি খরগোশের শরীরে প্রয়োগ করা হয়। এরপর আরও একটা খরগোশ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, যেটিতে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয় না। আরেকটি খরগোশের শরীরে প্লাসিবো দেওয়া হয়, যেখানে ভ্যাকসিনের অ্যাক্টিভ ম্যাটারিয়াল ছিল না, শুধু ফর্মুলেশন বাফার দেওয়া হয়। কন্ট্রোলে যেটি ছিল, সেটিতে কোনো কিছুই ইনজেক্ট করা হয়নি। আর যে খরগোশটিকে প্লাসিবো দেওয়া হয়, সেটিও নরমাল ছিল।

এরপর ১৪তম দিনে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা তিনটি খরগোশের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। রক্ত থেকে সিরাম আলাদা করে দেখা যায়, তিনটি খরগোশের শরীরেই যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়েই ভ্যাকসিনটির অ্যানিমেল ট্রায়ালের সাফল্য প্রমাণিত হয়।

এখন যে পর্যায়ে রয়েছে গবেষণা : ডা. আসিফ মাহমুদ জানান, দ্বিতীয় পর্যায়ের নিয়ন্ত্রিত অ্যানিমেল ট্রায়াল সম্পন্ন করার জন্য আপাতত ছয় থেকে আট সপ্তাহের সময় নেওয়া হয়েছে। এ পর্যায়ে আরও ব্যাপকভাবে অ্যানিমেল ট্রায়াল করা হবে। এক্ষেত্রে আরও নয়টি ক্যান্ডিডেটের ট্রায়াল হবে। সার্বিক ফলাফল পর্যালোচনা করে যে ক্যান্ডিডেটের রেজাল্ট বেশি কার্যকর প্রমাণিত (সুইটেবল) হবে, সেটা নিয়েই মানবদেহে প্রয়োগ বা হিউম্যান ট্রায়ালে যাওয়ার বিষয়ে প্রটোকল চূড়ান্ত করা হবে।

তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী মানবদেহে প্রয়োগ বা হিউম্যান ট্রায়াল মূল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্লোব বায়োটেক করতে পারবে না। গ্লোব বায়োটেকের করা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রটোকল বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদে (বিএমআরসিতে) জমা দেওয়া হবে। এরপর বিএমআরসির নির্ধারিত সিআরও (কন্ট্রাক্ট রিসার্চ অরগানাইজেশন) এটির হিউম্যান ট্রায়াল সম্পন্ন করবে এবং ফলাফল জানাবে। ফলাফল সঠিক হলে পরবর্তী সময়ে এটি নিবন্ধনের জন্য ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন চাওয়া হবে। সবকিছু ঠিকমতো সম্পন্ন হলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে উৎপাদিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বাজারে আনার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যাশার কথা জানান ডা. আসিফ মাহমুদ।

তিনি আরও জানান, এই ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রথম পর্যায়ে অ্যানিমেল ট্রায়ালে কোনো ধরনের টক্সিসিটি (বিষক্রিয়া) পাওয়া যায়নি। সুতরাং এটা মানুষের শরীরেও কোনো ধরনের টক্সিসিটি তৈরি করবে না, তা জোর দিয়ে বলা যায়। বর্তমান সময়ের উন্নত প্রযুক্তি আর বিশ্বমানের গবেষণা পদ্ধতি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছে গ্লোব বায়োটেক। আর আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে বড় জায়গা হচ্ছে, বিশ্ববিখ্যাত যত ভ্যাকসিন কোম্পানি আছে যেমন- আমেরিকার মর্ডানা, তারা একটিমাত্র ক্যান্ডিডেট এবং একটি ডেলিভারি সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। অক্সফোর্ডের ড. সারাহ গিলবার্টের টিম একটি ভাইরাল ফ্যাক্টর ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। আর গ্লোব বায়োটেক একই সঙ্গে ১২টি ক্যান্ডিডেট নিয়ে কাজ করছে। এ কারণেই গ্লোব বায়োটেক এই ভ্যাকসিনের সাফল্য নিয়ে গভীর আত্মবিশ্বাসী।

দাম নাগালে থাকবে তো? : বর্তমানে বিদেশি কোম্পানির ফর্মুলা অনুযায়ী করোনার চিকিৎসায় রেমডিসিভিরসহ কয়েকটি ওষুধ বাংলােেদশে এসেছে। তবে তার দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ অবস্থায় গ্লোব বায়োটেক ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে সফল হলে তার দাম হাতের নাগালে থাকবে তো?

ডা. আসিফ মাহমুদ বলেন, দামের ব্যাপারে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ দাম নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে মানবদেহে প্রয়োগের ক্ষেত্রে খরচ নিয়ে। তিন ধাপে এই ট্রায়াল করতে হবে। এ ছাড়া হিউম্যান ট্রায়াল একটা থার্ড পার্টি দিয়ে করাতে হয়। এ কারণে তাদের জন্য খরচ কেমন হবে সেটার ভিত্তিতে এবং অন্যান্য খরচের বিষয় মূল্যায়ন করেই ভ্যাকসিনের মূল্য নির্ধারিত হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে জানান, বাংলাদেশে উৎপাদিত হলে দাম অবশ্যই আমদানি করা ভ্যাকসিনের চেয়ে অনেক কম হবে এবং তা সাধারণ মানুষের হাতের নাগালেই থাকবে।

আরও পড়ুন

  • এক্সক্লুসিভ এর আরও খবর