• ঢাকা
  • সোমবার, ১৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৩ মে, ২০২১
সর্বশেষ আপডেট : ৩ মে, ২০২১

স্পীডবোটের সংর্ঘষে নিহত ২৬ জনের লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর

অনলাইন ডেস্ক

বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের কাঁঠালবাড়ী পুরাতন ঘাট সংলগ্ন এলাকায় নোঙ্গর করা বাল্কহেডের সাথে দ্রুতগতির স্পীডবোটের সংর্ঘষে স্পীডবোটটি দুমড়েমুচড়ে শিশুসহ নিহত ২৬ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের সবার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহৃ সৃষ্টি হয়ে রক্তক্ষরন হয়েছে। কারো পড়নেই লাইফজ্যাকেট দেখা যায়নি।

 

নিহত ২৬ জনের লাশ সনাক্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় ৫ জনকে আহতাবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষনিক নিহতদের পরিবার প্রতি নগদ ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। এঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক আজহারুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

সরেজমিনে একাধিক সুত্রে জানা যায়, আজ সোমবার ভোর সাড়ে ৬ টার দিক শিমুলিয়া থেকে ৩১ জন যাত্রী নিয়ে কান্দু মোল্লা ও জহিরুল ইসলামের মালিকানাধীন একটি বড় মাপের স্পীডবোট শাহ আলম নামের এক চালক চালিয়ে বাংলাবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। স্পীডবোটটি কাঁঠালবাড়ী (পুরাতন ফেরিঘাট) ঘাটের কাছে আসলে নদীর পাড়ে নোঙ্গর করে রাখা একটি বাল্কহেডের (বালু টানা কার্গো) পেছনে সজোরে ধাক্কা লেগে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে সকল যাত্রী মাথায় বুকে গুরুতর আঘাত পেয়ে পদ্মায় পড়ে নিখোঁজ হয়। ৫ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা পাড়ে তুলতে সমর্থ্য হয়। খবর পেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই নৌপুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

 

পরে সেনাবাহিনী সদস্য, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ গ্রহন করে। দুপুরের মধ্যেই উদ্ধার কর্মীরা শিশুসহ ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত লাশগুলো শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের দোতারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়। দুপুরেই নিহতদের লাশ শনাক্তে স্বজনরা দোতারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আসতে শুরু করে। এসময় নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠে।

 

নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের মহাপরিচালক কমোডর জালালউদ্দিন আহমেদ, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম, মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন, পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ¦ আঃ লতিফ মোল্লা,শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আসাদুজ্জামান, ওসি মিরাজুল হোসেন, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ডাঃ মোঃ সেলিমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন।লাশগুলোর প্রতিটির মাথায়ই মারাত্মক জখমের দাগ দেখা গেছে। লাশ হস্তান্তরকালে মাথা দিয়ে রক্তক্ষরন হচ্ছিল। এছাড়াও কোন লাশের শরীরেই লাইফ জ্যাকেট ছিল না।

নিহতদেও লাশ হস্তান্তরের সময় পরিবার প্রতি নগদ ২০ হাজার করে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন প্রশাসন। এ দূর্ঘটনার কারন তদন্তে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ পরিচালক আজহারুল ইসলামকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিহতরা হলেন খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার বারুখালির মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙা গ্রামের বাবা আরজু শেখ (৫০), ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারী (৪০), কুমিল্লা দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০), রুহুল আমিন (৩৫), মাদারীপুর জেলার রাজৈরের তাহের মীর (৪২) ও কুমিল্লার তিতাসের জিয়াউর রহমানের (৩৫), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮), শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশাল তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুর রায়েরকান্দি মাওলানা আব্দুল আহাদ (৩০), চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলব মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইল লোহাগড়া রাজাপুর জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সিগঞ্জ সদর সাগর শেখ (৪১), বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জ সায়দুল হোসেন (২৭), রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকা পিরেরবাগ খেরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠি নালসিটি এসএম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশাল মেহেন্দিগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুর চরখামা মো. বাপ্পি (২৮), পিরোজপুর ভান্ডারিয়া জনি অধিকারী (২৬) । অপর নিহত যাত্রী বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মনির হোসেন জমাদ্দারের (৩৫) নাম নিশ্চিত হলেও পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।

নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, শিমুলিয়া –বাংলাবাজার রুটে স্পীডবোট সার্ভিসটি একপ্রকার অত্যাচারে রুপ নিয়েছে। দ্রুতগতির এ নৌযানটির নেই কোন রেজিস্ট্রেশন নাম্বার । নেভিগেশন আলোকবাতি নেই কোন স্পিডবোটে। চালকদের নেই নুন্যতম প্রশিক্ষন সনদ। রাতে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গভীর রাত পর্যন্ত চলে স্পীডবোট। করোনা লকডাউনের শুরু থেকেই এ নৌযানটি চলাচল বন্ধ থাকলেও নিয়মিতই চলছে এটি। বিশেষ করে শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রকাশ্যেই টিকিট কেটে চলছিল স্পীডবোটগুলো। শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার আওয়ামীলীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আশরাফ হোসেন ও বাংলাবাজার ঘাটের ইজারাদার স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা ইয়াকুব বেপারি। প্রত্যেক যাত্রীকে লাইফজ্যাকেট পড়ানো বাধ্যতামুলক থাকলেও নিহত ২৬ জনের কারো পরিধানেই একটি লাইফ জ্যাকেটও ছিল না।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন, ছোট্ট মীম এই দূর্ঘটনায় তার মা বাবা ২ বোনকে হারিয়েছে। আমরা তার সাথে ২ জন লোক দিয়ে ওই থানা ও ইউএনওর কাছে লাশ পাঠিয়েছি। যে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়েছে কোনটির পড়নেই লাইফ জ্যাকেট ছিল না। সবার মাথায়ই আঘাতের চিহৃ। লকডাউনে মূলত শিমুলিয়া পাড়ের স্পীডবোটগুলোই বেপরোয়।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, দূর্ঘটনায় নিহতদের শেষকৃত সম্পন্নের জন্য পরিবার প্রতি ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে। দূর্ঘটনার কারন অনুসন্ধানে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ দিনের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী দোষীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

আরও পড়ুন