• ঢাকা
  • রবিবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১
সর্বশেষ আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

প্রযুক্তির সুফল পেতে সাইবার স্ল্যাকিং বর্জনীয়

অনলাইন ডেস্ক

করোনা মহামারিতে বাংলাদেশ ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে। নাগরিক সমাজের সব কাজকর্ম এখন প্রযুক্তির সহায়তায় অনলাইনে চলমান। বর্তমান সময়ে ওয়েবিনার, অনলাইন মিটিং বা অনলাইন ক্লাসে একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা বন্ধ করে অনেক অংশগ্রহণকারী মিটিংয়ে যুক্ত থেকে অন্য কাজে ব্যস্ত থাকছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসগুলোতে যুক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা অফ করে শিক্ষকের কথা না শুনে বিভিন্ন গ্রুপে চ্যাট করে এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা আদান-প্রদান চালু রাখে।

অনলাইন ক্লাস চলাকালীন শিক্ষার্থী ঘুমিয়ে পড়ার কারণে নাক ঢাকার শব্দ শোনার মতো ঘটনাও ঘটছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা ঘণ্টা ব্যয় হলেও এর কার্যকর সুফল পাওয়া খুবই দুরূহ হয়ে পড়ছে। আমার পর্যবেক্ষণে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা না বুঝেই এমন আত্মঘাতীমূলক কর্মকাণ্ড করে, যার কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তারা হতাশায় ভুগতে থাকে। সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ওয়েবিনারে যুক্ত ছিলাম। নির্দিষ্ট এক ব্যক্তিকে নাম উল্লেখ করে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ করা হলেও অপরদিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তিনি অনলাইনে যুক্ত আছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি ওয়েবিনার বা ভার্চুয়াল মিটিংয়ের ছন্দপতন ঘটায়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলো এড়ানোর জন্য সচেতনতা জরুরি। করোনাকালীন সশরীরে উপস্থিত থেকে মিটিং করা যাচ্ছে না বলেই ভার্চুয়াল মিটিংয়ের আয়োজন। এই আয়োজনে যদি সবার আন্তরিকতা ও মনোযোগ না থাকে, তাহলে ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতায় ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে অফিস সময়ে নিজের দাপ্তরিক কাজ বাদ দিয়ে ব্যক্তিগত কোনো কাজেও আমরা অনেকেই অনেক সময় ব্যস্ত থাকি। ইন্টারনেটের গতি ও সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্মার্টফোন হাতের নাগালে থাকায় এ ধরনের কার্যক্রম নিজের অজান্তেই বেড়ে চলেছে। ফলে অফিসে কর্মরত জনগোষ্ঠীর প্রকৃত কর্মঘণ্টা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে। ব্যক্তিগত কাজের মধ্যে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্রাউজিং, নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট ব্রাউজিং, অনলাইন শপিং, অনলাইন গেম ইত্যাদি। এ বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা এখন সময়ের দাবি।

ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো অফিস সময়ের মধ্যে যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঘটে, তাহলে এ ধরনের কাজকে বলা হয় সাইবার স্ল্যাকিং (Cyber Slacking)। সাইবার অর্থ ইন্টারনেট ও কম্পিউটার সম্পর্কিত। আর স্ল্যাক অর্থ ধীর। দাপ্তরিক বা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোনো কাজের সময় ইন্টারনেট ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের কারণে আমাদের দাপ্তরিক কাজের গতি সার্বিকভাবে মন্থর হয়ে পড়ে। একে সাইবার স্ল্যাকিং বলে। আমরা কেউই উপলব্ধি করতে পারি না এর কারণে কী পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। তবে পাশ্চাত্যের কিছু গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সাইবার স্ল্যাকিংয়ের ক্ষতির দিকটি কিছুটা অনুধাবন করতে পারি।

কয়েক বছর আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব পারসোন্যাল ডেভেলপমেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে শুধু সেখানে কর্মরত জনবলের ব্যক্তিগত ব্রাউজিংয়ের কারণে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অফিসের কর্মচারীরা ইনস্ট্যান্ট মেসেজ, অনলাইন শপিং, ব্লগিং ইত্যাদির মাধ্যমে সময় নষ্ট করেছেন। একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত গবেষণায় প্রতীয়মান, প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরিরত জনবল ১ দশমিক ৪৪ ঘণ্টা তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ইন্টারনেট ব্রাউজ করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব তাদের কর্মজীবনে পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি জরিপের ফলাফল বলছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের জনবল সাইবার স্ল্যাকিংয়ে কর্মক্ষেত্রের ২০ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশ সময় নষ্ট করে। ভারতে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি কর্মদিবসে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিগণ ১ দশমিক ৫৫ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, ১ দশমিক ৪৪ ঘণ্টা বিনোদন মাধ্যমে, ১ দশমিক ৪৬ ঘণ্টা জ্ঞান আদান-প্রদানে, ১ ঘণ্টা বিল প্রদানে ব্যয় করছে। পাশাপাশি আমেরিকার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় আরো একটি বিষয় উঠে এসেছে, তা হলো ১ হাজার জনবলের একটি কোম্পানি বছরে ৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হবে, যদি ওই কোম্পনির জনবল প্রতিদিন অফিস সময়ের এক ঘণ্টা সাইবার স্ল্যাকিংয়ে ব্যয় করে।

পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো আমাদের অনেক আগেই ডিজিটাল সিস্টেমের আওতাধীন। তাই সাইবার স্ল্যাকিং রোধে তাদের অনুসৃত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাঞ্ছনীয়। সাইবার স্ল্যাকিং নামক অর্থনীতির গুপ্তঘাতক জাতীয় অগ্রগতির জন্য বড় বাধা। আমাদের দেশের কর্মক্ষেত্রগুলোয় ইন্টারনেটের ব্যবহারে সাইবার স্ল্যাকিং পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট সার্ভার রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। কার্যকর মনিটরিং সেল স্থাপিত হলে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিগণ তাদের কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা যেমন জরুরি, তেমনি সম্পদের সুষম বণ্টন, উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, সরকারি কাজের জটিলতা নিরসন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ডিজিটাল বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এর সঠিক সুফল পেতে আমাদের ডিজিটাল সিস্টেমের নেতিবাচক প্রভাবগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। এর জন্য চাই বিষয়গুলো নিয়ে মানসম্মত গবেষণা। গবেষণালব্ধ জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে সমস্যাগুলো সমাধান করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। ইন্টারনেটের সংযোগ ও ব্যবহার তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের সব ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করেছে। করোনাকালীন অফিস আদালত, শিক্ষা সবই ইন্টারনেট ও ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ওপর নির্ভরশীল। এই মহামারির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের জীবনকে করেছে নিরাপদ, গতিময় ও সহজতর। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় জ্ঞানার্জন, জ্ঞান আহরণ ও জ্ঞানভান্ডার সৃষ্টির এক অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পৃথিবী জুড়ে। বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারলে দেশে বসেই বিদেশের কাজ করার অবারিত সুযোগ তৈরি হবে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে সাইবার স্ল্যাকিংয়ের কুফল সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। জনবলের কর্মঘণ্টার সঠিক ব্যবহারের নিমিত্তে আইন প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিলেই জেগে উঠবে জাতি, গড়ে উঠবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

লেখক: উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন